শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক খসড়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৮ম ও ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাইয়ে নেওয়া পরীক্ষায় যেখানে ৮০ শতাংশ নম্বর অর্জনের প্রত্যাশা করা হয়েছিল, সেখানে বাস্তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই দুই বিষয়ে ন্যূনতম পাশ নম্বরও অর্জন করতে পারেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরীক্ষাগুলো ছিল পাঠ্যবইভিত্তিক ও মৌলিক দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য প্রণীত, কোনো উচ্চতর বা জটিল প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবুও ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলায় তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য অগ্রগতি থাকলেও ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল হওয়ার হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই চিত্র শুধু শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল কেন
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খসড়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল হওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রাথমিক স্তর থেকেই মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি। ভাষা বোঝা, বাক্য গঠন, সাধারণ গণিতের সূত্র ও সমস্যা সমাধানের মতো ভিত্তিমূলক দক্ষতা অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে ওঠেনি। এই দুর্বল ভিত্তি নিয়ে শিক্ষার্থীরা যখন মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছে, তখন পাঠ্যবস্তুর জটিলতা তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শ্রেণিকক্ষে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি ইংরেজি ও গণিতে কার্যকর শিখন নিশ্চিত করতে পারছে না। ইংরেজিতে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে ভাষা ব্যবহারের সুযোগ পায় না, আর গণিতে যুক্তি ও বিশ্লেষণভিত্তিক অনুশীলনের অভাব রয়েছে। ফলে পরীক্ষায় সহজ ও পাঠ্যবইভিত্তিক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত নম্বর অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যার শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত সহায়ক শিক্ষাসামগ্রীর সংকট এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার অভাবও ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষকদের ওপর প্রশাসনিক ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ গুণগত পাঠদানে সময় ও মনোযোগ কমিয়ে দিচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জনে পড়ছে।
ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল হওয়ার প্রধান কারণ
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খসড়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল হওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রাথমিক স্তরেই শিখনের ভিত্তি দুর্বল থাকা। অনেক শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় শব্দভান্ডার, বাক্য গঠন ও পাঠ-বোঝার দক্ষতা ছাড়াই মাধ্যমিক স্তরে উঠে আসে। একইভাবে গণিতে মৌলিক ধারণা, সূত্র প্রয়োগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি না হওয়ায় উচ্চ শ্রেণিতে গিয়ে তারা পাঠ্যবস্তুর সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভর শিখন পদ্ধতি চালু থাকায় ইংরেজি ও গণিতে বাস্তব প্রয়োগভিত্তিক দক্ষতা গড়ে উঠছে না। ইংরেজিতে ভাষা চর্চার সুযোগ সীমিত এবং গণিতে যুক্তি, বিশ্লেষণ ও ধাপে ধাপে সমস্যা সমাধানের অনুশীলন কম থাকায় পরীক্ষায় সহজ প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের বড় অংশ ন্যূনতম পাশ নম্বর অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে।
জীবনের প্রথম ভোট দিতে পারছেন না চবির হাজারো শিক্ষার্থী
এ ছাড়া অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যার শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত সহায়ক শিক্ষাসামগ্রীর অভাব এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতাও ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শিক্ষকদের ওপর প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক চাপ বাড়ায় গুণগত পাঠদানে প্রয়োজনীয় সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিখন অর্জনে।
ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের ফেল, বাস্তবে ভয়াবহ চিত্র
মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত কনসালটেশন কমিটি মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি খসড়া প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি জলাবদ্ধ এলাকা, চর, হাওড়, উপকূলীয় অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল, অতিদরিদ্র এলাকা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও শরণার্থী অধ্যুষিত অঞ্চলে অবস্থিত ১১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ১০টি বিদ্যালয়ের ৮ম ও ৯ম শ্রেণির মোট ৪৩৭ জন শিক্ষার্থীর ওপর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে ৫০ নম্বরের একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়, যেখানে বাংলা ও ইংরেজিতে ১৫ নম্বর এবং গণিতে ২০ নম্বর নির্ধারিত ছিল। পরীক্ষাগুলো ছিল পাঠ্যবইভিত্তিক ও মৌলিক দক্ষতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে প্রণীত হলেও ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলায় তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য অগ্রগতি থাকলেও ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের গড় স্কোর মোট নম্বরের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইংরেজিতে ৫৫.৪ শতাংশ এবং গণিতে ৭১.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ৩৩ শতাংশের নিচে নম্বর পেয়েছে, আর গণিতে উচ্চ স্তরের শিক্ষার্থীর হার ছিল মাত্র ৫.৭ শতাংশ, যা গাণিতিক যুক্তি ও সমস্যা সমাধানমূলক দক্ষতার গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। এই ফলাফল ২০১৫ সালের LASI প্রকল্পের পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একই ধরনের দক্ষতার ঘাটতি ধরা পড়েছিল। প্রতিবেদনের আলোকে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়, কারণ সে বছর পাশের হার ছিল ৬৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি, যার বড় অংশই ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার কারণে অকৃতকার্য হয়েছে।


Pingback: উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ দিচ্ছে রোমানিয়া সরকার ২০২৬ - Tips Breaf
Pingback: টানা দেড় মাসের ছুটিতে যাচ্ছে মাদ্রাসা - Tips Breaf